সময় কীভাবে বদলে দেয় জীবনকে। একসময় বাড়ির লোকদের দেখতে না পেলে মনটা ভারাক্রান্ত হত।
বিন্দু // জয়নারায়ণ সরকার
বোসবাবুর জীবনের অধিকাংশ সময় কেটেছে ভারতের বিভিন্ন শহরে। যদিও বাংলাদেশ থেকে চলে আসা পুরো পরিবারটি আস্তানা গেঁড়েছিল পশ্চিমবঙ্গের প্রত্যন্ত গ্রামে। বোসবাবু তখন ইন্টারমিডিয়েট পাশ। পরিবারে তখন মোট দশ জন। কোনো মতে সংসার টেনে চলেছেন বাবা-কাকারা। বাবার বয়েস একটু বেশি হওয়ায় কোথাও চাকরি মেলেনি। কাজেই ব্যবসা শুরু করেন। স্থানীয় এলাকার দোকানে দোকানে ফিনাইল সাপ্লাই। রোজগার তেমন না হলেও কোনোদিন অসুবিধার সম্মুখীন হতে হয়নি বোসবাবুকে। পরিবারের সবাই ওকে যেন আগলে রাখত। প্রথম যেদিন চাকরির খবরটা জানিয়েছিল, সেদিন যেন সবার মনে আনন্দের বন্যা বয়ে গিয়েছিল। তারপর সেই গ্রামের মেঠো পথ ধরে চলে এসেছিল দিল্লি।
এসব তো কত দিন আগের কথা। পরিবারটা আজ যেন ছন্নছাড়া হয়ে পড়েছে। বড় বড় মহীরূহের ছায়ায় বসতে আজও মন কেমন করে। এক খুড়তুতো বোনের বিয়ে হয়েছে ব্যাঙ্গালোরে। কদাচিৎ দেখাসাক্ষাৎ। ওই ফোনে ফোনেই যতটুকু আর কী!
সময় কীভাবে বদলে দেয় জীবনকে। একসময় বাড়ির লোকদের দেখতে না পেলে মনটা ভারাক্রান্ত হত। আর এখন হয়েছে তার দুই মেয়ে। তারা যেন বোসবাবুর প্রাণ। বদলির চাকরির দরুণ পুরো পরিবারকে ঘুরতে হয়েছে সারা দেশ। তবে বোসবাবু বরাবর একরোখা ধরনের মানুষ। যেটা সত্যি বলে জানেন সেটাই প্রতিষ্ঠা করেন। কিন্তু চাকরিতে উপরওয়ালার সঙ্গে পাঙ্গা নেওয়ার ফল মিলেছে বার বার। কোনো অফিসে দু-বছর আবার কোনোটা তিন বছর অবধি ছিলেন, তারপরই বদলির চিঠি পেতেন হাতে। শেষে রিটায়ারমেন্টের দু-বছর আগে বদলি হয়ে আসেন কলকাতায়। তখন অবশ্য দুই মেয়ে গ্র্যাজুয়েশন কমপ্লিট করেছে কম্পিউটার ভোকেশনাল কোর্স নিয়ে। এদিকে অবসর নেওয়ার সময় পাওনাগন্ডা ভালই পেয়েছিলেন। সেসব ব্যাঙ্ক আর পোস্ট অফিসে গচ্ছিত রেখে দিন সহজেই কেটে যায়। তার চাহিদাও খুব কম। স্ত্রীও খুব ভাল করে বোঝেন তাঁকে। বারবার বদলিতে কখনও বিরক্ত প্রকাশ করেননি। সব সময় পাশে থেকেছেন স্বামীর। কেননা তাঁর মনে একটা অহংকার আছে, উনি কোনওদিন মিথ্যের সাথে আপস করেন না।
***
চাকরি থাকাকালীন কোয়ার্টারে বেশিরভাগ জীবন কেটে যাওয়ায় কোনওদিন নিজের একটা বাড়ি করার কথা ভাবেননি। তাছাড়া বোসবাবু তেমন বৈষয়িকও নন। রিটায়ারমেন্টের পর কোয়ার্টারের কাছাকাছি দু-কামরা ফ্ল্যাট নেওয়ার পেছনে স্ত্রীর অবদান বেশি। ততদিনে বড় মেয়ে টুম্পার বিয়ে হয়ে গেছে। তারও বাড়ি কাছাকাছি হওয়ায় বোসবাবু যেন স্বস্তি পান। এক নাতি কোল জুড়ে থাকে তাদের। এখন কোনো কিছুর অভাব বোধ করেন না। ছোট মেয়ে রুম্পা চাকরি করলেও তার ব্যাঙ্কের হিসেব রাখেন নিয়মিত। ইতিমধ্যে রুম্পার চাকরিতে বদলির নির্দেশ আসায় চলে যায় পুণে। প্রথম প্রথম খুব মনখারাপ হত তাঁর। তবে সকাল-বিকেল দু-বেলা ফোনে কথা বললে মনখারাপ কিছুটা নিরসন হত।
রুম্পার মতো সেও তো বেরিয়ে পড়েছিল চাকরি করার জন্য। তখন বাবা-মায়েরও তার মতো অবস্থা হয়েছিল। কিন্তু কখনও তা বুঝতে দেননি। এখন ফোনের সুবিধা থাকলেও তখন তো চিঠি ছাড়া কোনও উপায় ছিল না। তাও দু-সপ্তাহে বা মাসে একবার চিঠি আদানপ্রদান হত। এখন সেকথা ভেবে বোসবাবুর মনটা ভারাক্রান্ত হয়ে ওঠে।
***
অখণ্ড অবসর বোসবাবুর। বাজার করতে গিয়ে চায়ের দোকানে বসে খানিকটা সময় কাটান। রাজনীতি থেকে খেলা সমস্ত বিষয়ে বিভিন্ন মতামত শুনতে ভাল লাগে তাঁর। তবে কোনও কোনও বিষয়ে নিজের মতামত ব্যক্ত করতে ছাড়েন না। তাতে হয়তো কথা কাটাকাটি হয়, তবুও নিজের পোষণ করা ধারণার কথা বলবেনই। বাজার সেরে বাড়ি ফিরে সোফায় বসে আদ্যোপান্ত পড়েন খবরের কাগজ। পড়া হয়ে গেলে ব্যস্ত হয়ে পড়েন শব্দছক ভরাট করতে। এজন্য কলেজ স্ট্রিট থেকে একটা সংসদের অভিধানও কিনে এনেছেন। সহজে না পারলে অভিধানের সাহায্য নেন। এভাবে বেলা বাড়লে গিন্নির তাগাদায় স্নান সেরে খাওয়াদাওয়ার পর একটু দিবানিদ্রা।
সন্ধেবেলায় হাঁটতে বের হন। পার্কের ধারে সিনিয়র সিটিজেনদের একটা পাথরে বাঁধানো বেঞ্চে কিছুক্ষণ আড্ডা দিয়ে ফেরার পথে টুম্পার বাড়িতে একবার নাতিকে দেখতে ঢুঁ মারেন। এটা তাঁর এখন অভ্যেসে দাঁড়িয়েছে। বড়জামাই খুব বড় কিছু না করলেও তাদের সংসার চলে যায়। একদিনের জন্য কখনও মাথা ঘামাতে হয়নি। আর নাতি এখন তো মন-প্রাণ জুড়ে।
একদিন বাজার থেকে ফিরে সবে খবরের কাগজে মনোযোগ দিয়েছেন, এমন সময় স্ত্রী পাশে এসে বসে। তারপর বলে, কী গো, সারাক্ষণ কাগজ নিয়ে থাকলে হবে?
বোসবাবু অবাক হয়ে বলেন, কেন, কী করতে হবে।
স্ত্রী খানিকটা অভিমানের সুরে বলে, রুম্পার বিয়ের ব্যাপারে কিছু ভাববে না?
বোসবাবু খবরের কাগজ পড়া বন্ধ করে হেসে বলেন, আমি কী ভাবব, টুম্পার বেলায় তুমিই তো সব করলে। এবারও তুমি না হয় শুরু করো।
স্ত্রী এবার আমতা আমতা করে বলে, আসলে রুম্পা ফোন করেছিল। ওর একজনকে পছন্দ হয়েছে। সেও পুণাতে চাকরি করে আর তাদের বাড়ি এই অঞ্চলে, রেললাইনের ওপারে নীচু মাঠ বলে একটা জায়গা আছে সেখানে। ওই বাড়িতে ছেলের বাবা আর মা থাকেন।
এক নিশ্বাসে কথাগুলো বলে থামেন স্ত্রী। কথাগুলো বাংলা সিরিয়ালের স্ক্রিপ্টের মতো শোনায়। বোসবাবু একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকেন। কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলেন, তা আমাকে কী করতে হবে?
স্ত্রী আরও আড়ষ্ট হয়ে বলে, আসলে রুম্পা বলছিল, আমরা যদি একবার ওঁনাদের বাড়ি গিয়ে কথা বলে আসি।
বোসবাবুর ভ্রূ কুঁচকে ওঠে। পরক্ষণে নিজেকে সামলে নিয়ে বলে, ওসব তুমি ঠিক করো। যেদিন বলবে আমি তোমার সাথে যাব।
স্ত্রী আর কথা বাড়ায় না। তবে বোসবাবু খেয়াল করেছেন রুম্পা ফোন করলেই স্ত্রী অন্য ঘরে ঢুকে গিয়ে চুপিসারে কথা বলে।
ওদের বাড়িতে যাওয়ার দিন স্ত্রীর মধ্যে উন্মাদনা লক্ষ্য করেন বোসবাবু। টুম্পা আর জামাইকে বললেও তাদের কাজ থাকায় যেতে পারেনি।
বিয়ের পাকা কথা হয়ে যায়। ফোনে ধরা হয় পাত্র ও পাত্রীকে। মোবাইল ফোনটা স্পিকারে রাখা হয় যাতে সবাই শুনতে ও বলতে পারে। সামনের বৈশাখ মাসে দিনক্ষণ ঠিক হয়।
রুম্পা সদ্য চাকরিতে জয়েন করায় মাস ছয়েকের মধ্যে কোনও ছুটি পাবে না। কিন্তু দুই বাড়ির অভিভাবকরা দেরি করতে নারাজ। বিদেশ বিভুঁইয়ে সংসার পেতে দিলে আর কোনও টেনশন থাকবে না। তাই ঠিক হয় পুণেতেই বিয়ে হবে। যেহেতু কলকাতায় নয়, তাই এই মুহূর্তে পাত্রের বাবা আত্মীয়-পাড়া প্রতিবেশীদের খবরটা জানাতে বারণ করেন।
কথাটা শুনে বোসবাবুর স্বভাবসুলভ স্বর বেরিয়ে আসে। বলেন, আপনি কাউকে না বললেও, আমি সবাইকে বলব।
উত্তেজনায় কথাগুলো বেশ রুক্ষ শোনায়। সাথে সাথে পাত্রের বাবার চোখ-মুখ বদলে যায়।
রুম্পা আর জামাই দুজনেই চাকরি করে বেশ উন্নতি করেছে। প্রত্যেক বছর চার মাস আগে থেকেই ট্রেনের টিকিট কেটে রাখেন। বছরে একবার মাসখানেকের জন্য সস্ত্রীক যান বোসবাবু। বড় সোসাইটিতে ফ্ল্যাট কেনার পেছনে বোসবাবু ও স্ত্রীর ভূমিকা নিয়ে জামাইয়ের স্বীকারোক্তি তাঁদের ভেতরটা ভরাট করে রাখে। মাঝে মাঝে বোসবাবু বলেন, নিজের ফ্ল্যাট কিনতে এত খাটনি হয়নি, যা হল রুম্পার জন্য।
রুম্পারা একটা গাড়ি কেনায় বেশ গর্ববোধও করেন বোসবাবু। তবে ছোট জামাইয়ের অহেতুক খরচ করার প্রবণতা তাঁর ভাল লাগে না। স্ত্রী তাঁকে বলতে বারণ করলেও তিনি স্বভাবজাতভাবেই দু-একবার বলেও ফেলেছেন।
প্রতিবার যাওয়ার সময় লাগেজে থাকে তাঁর বহুদিনের প্রিয় একটা ব্যাগ। সেটা খানিকটা রং চটে যাওয়ায় জৌলুস হারিয়েছে। তবুও তাকে ত্যাগ করতে পারেননি। ওই ব্যাগের সাথে কত স্মৃতি জড়িয়ে।
স্টেশনে ট্রেন থামতেই রুম্পা আর জামাইকে দেখতে পান। জামাই ড্রাইভ করে নিয়ে আসে বাড়িতে। ডিকি থেকে লাগেজ নামিয়ে লিফটে উঠে যান বোসবাবু। ওঠার সময় খেয়াল করেন জামাই রুম্পাকে চিৎকার করে কিছু বলছে। উনি লিফটের দশ নম্বর বোতামটা টিপে দেন। ঘরে ঢুকে মনটা বিষাদে ভরে ওঠে। মাথায় একটা চিন্তা ভিড় করে আসে, জামাই কী বলছিল ও রকম চিৎকার করে।
সন্ধেবেলায় ড্রয়িংরুমে ছড়িয়েছিটিয়ে বসে গল্পগুজব জমে উঠেছিল। সেইসাথে চা-পর্ব। হঠাৎই রুম্পা বলে, বাবা, তোমার ওই ব্যাগটা আনা ঠিক হয়নি।
তাল কেটে যায় বোসবাবুর। অবাক চোখে তাকিয়ে বলেন, কেন রে ব্যাগটা আবার কী দোষ করল?
রুম্পা কিছু একটা বলার আগেই জামাই তিরিক্ষি গলায় বলে, এই সোসাইটিতে আমাদের প্রেস্টিজ আছে। এ রকম ব্যাগ দেখলে সবাই কী ভাববে?
অবাক বিস্ময়ে বোসবাবুর চোখ দুটো বড় দেখায়। অস্ফুট স্বরে বলেন, মানে সামান্য রংচটা ব্যাগ এখানে অ্যালাউ নয়। আমি তো দেশের কত জায়গায়...
কথা থামিয়ে দিয়ে রুম্পা বলে, আসলে বাবা, ও তোমার সম্মানের...
বোসবাবু রুম্পার দিকে তাকাতেই সে চুপ করে যায়। বাবার মুখটা লাল হয়ে উঠেছে। সে এরকম চেহারা কোনওদিন দ্যাখেনি।
বোসবাবু দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেন, এ নিয়ে আর কোনও কথা শুনতে চাই না।
রাত তখন বেশ ঘন হয়ে আছড়ে পড়ছে ব্যালকনিতে। বোসবাবু উঠে ধীরে ধীরে গিয়ে রেলিং ধরে দাঁড়ান। অন্ধকারে ক্রমশ মিশে যেতে ইচ্ছে করছে তাঁর। দশতলার ওপর থেকে রাস্তার আলোগুলো আজ ছোট ছোট বিন্দুর মতো দেখাচ্ছে...
Post a Comment