মোহনার কাছাকাছি এসে: দিলীপ চন্দ, গীর্বাণ প্রকাশন, কলকাতা-৭০০০০৬,মূল্য-১৬০ টাকা। প্রচ্ছদ:দেবার্ঘ্য সেন।

 

দিলীপ চন্দ

অকপট সারল্য এবং অনপনেয় জীবনবাদী সম্মোহন

তৈমুর খান 

গ্রামের কাঁচা রাস্তায় ধুলো পায়ে হেঁটে আসছেন একজন মানুষ। খালি গা। সঙ্গে আনছেন ধান গাছের শিহরন। সরষে ফুলের আনন্দ ঢেউ। মেঠো বাতাসে সমস্ত শরীর-মন জুড়ে পুলক জাগাচ্ছে। কিন্তু রোদ-বাতাসে শুকনো মুখ। স্নান করে খেতে বসবেন। ঘোষখুড়ি তেল-গামছা বাড়িয়ে দেয়। স্নান সারা হলে পিড়ি পেতে উঠোনে বসেন। ধোঁয়া ওঠা ভাতের থালা এগিয়ে দেয়। ভাত খেতে খেতেই জীবনের প্রত্যয় বেড়ে যায়। মানুষটি তখন উচ্চারণ করেন:

 "শালুক পাতায় জন্ম লিখেছি

 পলাশ পাতায় মৃত্যু লিখলেও

 এখনো হাঁটব দীর্ঘ পথ"

 জন্ম এবং মৃত্যু দুই বিন্দুর একটি সরলরেখা। যে অনুরাগ নিয়ে মেঠো পথে মানুষটি হেঁটে এলেন তাকে কি আমরা চিনি? তিনি এই বাংলার মানুষ। তিনি এই বৃষ্টি-জলে ভেজা মানুষ। তিনি এই রোদ্দুরে গা-সেঁকা মানুষ। তিনি অন্য কিছু নন। আর একবার সেই পরিচয়ও দিয়েছেন:

 "আমি বেদুইন নই

 উটের পিঠে চেপে মরুভূমি পাড়ি দিইনি।

 আমি মোষের পিঠে চেপে জঙ্গলে গেছি"

 তখন চিরপরিচিত এই মানুষটিকে আর চিনতে আমাদের অসুবিধা হয় না। আমাদের একান্ত আপনজন হয়ে ফিরে আসেন। তিনি মোষ চরাতে গিয়ে মোষের উপর বিরক্ত হয়েছেন। ফড়িং এর ডানা ছিঁড়েছেন। প্রজাপতি ধরে মেরে ফেলেছেন। চড়ুই পাখির বাচ্চা পেড়ে আগুনে ঝলসে খেয়েছেন। তারপর অনুশোচনা এসেছে। সকলের কাছে ক্ষমা চেয়েছেন। দয়ার্দ্র চিত্তে মহানুভবতার পাঠ নিয়ে কবিতার কাছে তথা নিজের সম্মুখেই দাঁড়িয়েছেন:

 "ভেতরের আর্তস্বরে বিদ্ধ হতে হতে

 নিজের কাছে দাঁড়াই

 নিজের কাছে

 নিজেরই কাছে!"

 নিজের কাছে দাঁড়ানো মানুষকে আত্মোপলব্ধির মানুষ হিসেবেই আমরা পাই। নিজেকে জানা-ই প্রকৃত জ্ঞানী মানুষের পরিচয়। 'দ্য লাইট ইন দ্য হার্টে'র লেখক রয় টি. বেনেট যিনি ইতিবাচক চিন্তাভাবনা এবং সৃজনশীল অন্তর্দৃষ্টি ভাগ করে নিতে পছন্দ করেন যা অগণিত মানুষকে সফল এবং পরিপূর্ণ জীবন যাপন করতে সাহায্য করেছে। তিনি বলেছেন:

"You are unique. You have different talents and abilities. You don’t have to always follow in the footsteps of others. And most important, you should always remind yourself that you don't have to do what everyone else is doing and have a responsibility to develop the talents you have been given."

(Roy T. Bennett, The Light in the Heart)

 অর্থাৎ তুমি একেবারেই আলাদা।তোমার বিভিন্ন প্রতিভা এবং ক্ষমতা আছে। তোমাকে সবসময় অন্যের পদাঙ্ক অনুসরণ করতে হবে না। এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, তোমাকে সর্বদা নিজেকে মনে করিয়ে দেওয়া উচিত যে অন্য সবাই যা করছে তা তোমাকে করতে হবে না এবং তোমাকে যে প্রতিভা দেওয়া হয়েছে তা বিকাশ করার দায়িত্ব তোমার রয়েছে।

 নিজেকে চেনার এবং নিজের সামর্থ্য অর্জনের প্রজ্ঞা বা অনুভূতি জাগিয়ে তোলার গ্রন্থটির নামই হল 'দ্য লাইট ইন দ্য হার্ট'। এই হৃদয়ের আলোর উৎসের সন্ধান পেয়েছেন আমাদের আলোচ্য কবি দিলীপ চন্দও। নিরাভরণ কবিতায় যে আত্মস্বর উঠে এসেছে তাতে কবিতাগুলিকে সদর্থক ভিন্ন মর্যাদা দান করেছে।

 কাব্যের নাম 'মোহনার কাছাকাছি এসে' (কলকাতা বইমেলা ২০২২) মোট ৫৮ টি কবিতা নিয়ে প্রকাশিত হয়েছে। জীবনের সারলতাকেই কবিতায় তুলে এনেছেন কবি। না, কোনো গিমিক নেই, ছলনা নেই। কবিতা নিয়ে নতুন কোনো পরীক্ষা-নিরীক্ষাও করতে চাননি। শুধু আশ্চর্য এক দরদি মন আর সংবেদনশীল হৃদয় নিয়েই শব্দ সাজিয়েছেন।শব্দতরঙ্গের বিন্দু বিন্দু অভিঘাতে ভালবাসার মহিমা ব্যঞ্জিত হয়েছে। এক আলোকময় দীপ্তির পরাগমোচন ঘটেছে। যখন কবি লেখেন :

"আমাদের তেমন কিছু নেই

কয়েক বস্তা ধান আর উঠোনে ছোট্ট খড়ের পালুই

 মায়ের কুলুঙ্গিতে দুটো ঘোড়া।"

 তখন আমাদের বাঙালি ঘরের চিত্রটিকেই দেখতে পাই। দিন-আনা দিন-খাওয়া জীবন অতিবাহিত করতে করতে আমরা বিশ্বাস করি 'সংসারে যেটুকু আছে তা পাহারা দিচ্ছে ওই ঘোড়া দুটি।'

 তেমন কিছু না থাকলে আমাদের ঘোড়া দুটি আছে। ঘোড়া দুটি স্থিতপ্রজ্ঞ ঋষি। বিশ্বজয় করার একমাত্র বাহন। আমাদের মর্ত্যজীবন এবং স্বর্গীয়জীবনের সেতুবন্ধন করে দিয়েছে এই ঘোড়া। তেমনি 'ছৌ' কবিতায় আছে:

 "মানুষ দীর্ণ হয়

 মানুষ ভাঙে না

 খিদেকে হারিয়ে বিশ্বময় ছৌ নেচে

 ফিরে আসে ওরা

 সারা মুল্লুক জেগে ওঠে গর্বের পদপাতে।"


 এখানেও সংস্কৃতি কতটা শক্তিশালী হলে ছৌ নাচের শিল্পীরাও কতটা মেরুদণ্ড সোজা করে দাঁড়াতে পারে তা বুঝিয়ে দিয়েছেন। সুতরাং দিলীপ চন্দের কবিতায় আমাদের সংস্কার, আমাদের সংস্কৃতি, আমাদের বেঁচে থাকা, আমাদের বিশ্বাস ও ধৈর্যকে ভালবাসতে শেখা, আমাদের খিদেকে উপেক্ষা করতে পারা, আমাদের সম্পর্ককে আরও সুদৃঢ় করে তোলা, আমাদের কল্পনাকে আশ্চর্য দিগন্তে মুক্তি দেওয়া— সবই খুঁজে পাই এই কাব্যে। কবিতাগুলিতে যেমন আছে অকপট সারল্য, তেমনিই অনপনেয় জীবনবাদী সম্মোহন। বোধের মরমিয়া স্পর্শে স্নেহাতুর আবেগের সঞ্চালন। সহজেই মরমে প্রবেশ করে। আমরা আমাদের অতীতকে দেখতে পাই। আত্মীয়তাকে আরও নিবিড় করে তুলতে পারি। উপলব্ধির এত বিস্তৃত মাঠ আছে আমাদের, গৌরবের এত ঐতিহ্য আছে আমাদের, ভালবাসার এত পরমার্থ আছে আমাদের—তা এই কাব্যের কাছে এসে টের পেলাম।


   দিলীপ চন্দ নিজস্ব ভাষায় ছবি আঁকেন। নিজস্ব বোধের দৃষ্টিতে সবকিছু দেখেন। নিজস্ব আলোর ফোকাসে তুলে আনেন দৈনন্দিনের উপাখ্যানগুলি। তাই আশ্চর্য গোলাপ বাগিচা থেকে গাছে গাছে পাতাদের জন্মান্তর ধরা পড়ে। প্রান্তর জুড়ে ছড়িয়ে পড়া কথা-ধ্বনি থেকে করতলে পাপ বেজে ওঠাও গোচর হয়। তারপর 'নিড়ান খেতার করা হাতে তার বেজে ওঠে মাঠের গল্পগুলি'। মেঠো মানুষের মাঠের গল্পে মাটির গন্ধ পেতে থাকি। ধানের শিষের গায়ে উপকারী নরম রোদ্দুর পড়া দেখে মনে পড়ে যায় শৈশবের খিলখিলিয়ে হেসে ওঠা। বীজ ফেলা, সার দেওয়া থেকে শুরু করে ফসল ফলানোর যাবতীয় প্রক্রিয়া চলতে থাকে। দুঃখের দিনে অসময়ে মেঘ জমে মাথার ওপর। আবার সুখের দিনে আনন্দ-গান বেজে ওঠে। এইভাবে মাটি আর মর্মের জীবনযাপনের অভিজ্ঞতা থেকেই কাব্যটির বিভূতি ও সংরাগ।


     যদিও আকাশ আর মাটিকে কবি জীবনের স্বপ্ন ও সংগ্রামের প্রত্যয়ভূমি হিসেবে দেখেছেন, তবু শান্তির নীড় গার্হস্থ্য জীবনের বাঁধন ও ভালবাসাকে এড়াতে চাননি। চিবুকের কালো তিলে যে হাত রেখে অনুরাগে রাঙা হয়ে ওঠে তাকে কি ভোলা যায়? কবির দ্বারেও বসন্ত আসে। শূন্য হতে হতে আবার পূর্ণের জন্য কবি ব্যাকুল হয়ে ওঠেন। দহন এসে পোড়ালেও আবার কবি সজীব হতে জানেন। তাঁর প্রিয়তমা ছন্দাকে চিরদিন ভালবাসার অঙ্গীকার করেন। জুঁই কিংবা পলাশে যেভাবেই তিনি থাকুন, কবি শুধু তাকেই দেখতে পান। এভাবেই আকাশ থেকে মহাকাশ, জীবন থেকে মহাজীবন, ক্ষুদ্র থেকে বৃহৎ, অন্তিম থেকে অনন্তে কবির যাত্রা। কবিতাগুলি সুখপাঠ্য। যে-কোনো শ্রেণির পাঠকের কাছেই আদরণীয় হবে বলেই মনে করি।



 মোহনার কাছাকাছি এসে: দিলীপ চন্দ, গীর্বাণ প্রকাশন, কলকাতা-৭০০০০৬,মূল্য-১৬০ টাকা। প্রচ্ছদ:দেবার্ঘ্য সেন। 


কবির সঙ্গে কথা :৭৮৭২৬৪৩৬৫৭


 


ছবি দিলীপ চন্দ 


দিলীপ চন্দ


দিলীপ চন্দ