লিটল ম্যাগাজিন রিভিউ
-ড. মহীতোষ গায়েন(অধ্যাপক,সিটি কলেজ,কলকাতা)
লেখক,প্রাবন্ধিক
ও সাংবাদিক,সম্পাদক-উৎস
মানুষ নিউজ,পশ্চিমবঙ্গ সম্পাদক,
-দৈনিক সুপ্রভাত উত্তরবঙ্গ
●Du-কলম, শীতকালীন সংখ্যা ১৪২৮
◆সম্পাদক- সুদেষ্ণা মিত্র।
◆সহ সম্পাদক- সৃজিত মিত্র,অত্রিয় মজুমদার।
◆প্রচ্ছদ ও অলংকরনঃ প্রচেতা মিত্র
■দপ্তর-এস ২৪৫, গ্রেটার কৈলাশ পার্ট ওয়ান,
নিউ দিল্লী ১১০০৪৮
◆মুদ্রকঃ গ্রাফিক্স রিপ্রোডাকশন,
কলকাতা ৭০০০০১
১৩ফর্মা
মূল্যঃ ১০০টাকা
----------------
Du-কলম-এর এবারের শীতকালীন সংখ্যাটি খুবই নান্দনিক ও সাহিত্য উৎকর্ষতায় পূর্ণ। সংখ্যাটিতে সম্পাদক সাজিয়েছেন প্রবন্ধ,গল্প,কবিতা,সাক্ষাৎকার,
রহস্য কাহিনি,ভৌতিক ও ভ্রমণ কাহিনি,চিত্রকলা মায় রান্না বান্নার রকমারি দিয়ে।এই সংখ্যায় ২টি সাক্ষাৎকার,১টি নাটক,১টি রম্য রচনা,
২টি উপন্যাস,১টি বড় গল্প,১৯টি গল্প,১টি স্মৃতিচারণ,৫টি প্রবন্ধ,১টি নিবন্ধ,৪টি ভ্রমণ কাহিনি,১৪টি কবিতা নির্বাচিত হয়েছে,এছাড়া আছে ছোটদের বিভাগ ও রান্নাবান্না বিভাগ।
সম্পাদক তার সম্পাদনায় যেমন মুন্সিয়ানার পরিচয় দিয়েছেন তেমনি তার কলমে আশাবাদ প্রকাশ পেয়েছে, ইচ্ছা থাকলে যে উপায় হয় তা তিনি আরও একবার প্রমাণ করলেন একটি উৎকৃষ্ট মানের লিটল ম্যাগাজিন প্রকাশ করে।রণজিৎ গুহ তার "বাঙালি কবে থেকে বাংলায় কথা বলে?" প্রবন্ধে বাংলা ভাষা কত পুরানো,কবে থেকে বাঙালি বাংলায় কথা বলে ইত্যাদি বিষয়ে যে তত্ত্বতালাশ করেছেন তা পাঠক সমাজকে সমৃদ্ধ করবে।
শৈবাল কুমার বোস তার ‘পথের পাঁচালি ও উইকিপিডিয়া’ প্রবন্ধে বিশ্ববরেণ্য চিত্র পরিচালক সত্যজিৎ রায়ের বিখ্যাত সিনেমাটির প্রযোজনার ক্ষেত্রে তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী বিধান চন্দ্র রায়ের হস্তক্ষেপ এবং বদান্যতার বিষয়ে নানান তথ্যের অবতারণা করেছেন। চিত্রনাট্যকার,কাহিনিকার ও পরিচালক দেবালয় ভট্টাচার্যের সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সুমনা চৌধুরী, এই সাক্ষাৎকারে ছবির জগতে আসা,চিত্র পরিচালনার নানান অজানা তথ্য উঠে এসেছে।নাট্যকার,অভিনেতা ও নির্দেশক ঋতব্রত মুখার্জির সাক্ষাৎকার নিয়ে ঋদ্ধিরাজরায়,থিয়েটার,
সিরিয়াল, স্ক্রিপ্ট তৈরি বিষয়ক সমৃদ্ধ তথ্য উপহার দিয়েছেন।
জ্যোতিষ্মান চট্টপাধ্যায় তার নাটিকা'উদাসীনতা'য় বাদ্যযন্ত্র নিয়ে সম্পর্কের বারোম্যাসার এক বাস্তব চিত্র উপস্থাপন করেছেন। স্বপ্না গুহঠাকুরতা তার "আলোকিত মানুষ গড়ার দেশে'-এ বাংলাদেশ ভ্রমণের গল্প,বাংলাদেশের সমাজ,সাহিত্য, সংস্কৃতির নানান অনুষঙ্গ চমৎকার উপস্থাপন করেছেন। জয়তী ধর পাল তার রম্য রচনা 'আমি যে বিবাহিত'-এ সুখী দাম্পত্যের টানাপড়েন ও প্রেমের স্বাদু বৈচিত্র্যের কাহিনি পরিবেশন করেছেন।
সৃজিত্ মিত্রের তার আলৌকিক উপন্যাস "পারুলে'-এ টানটান উত্তেজনা,শিহরণ,রহস্য রোমাঞ্চ উপস্থাপন করেছেন।অমর চট্টপাধ্যায়ের স্মৃতিচারণ 'একদিন' চমৎকার হয়েছে। মহুয়া বসুর চিত্র প্রবন্ধ -"অঙ্কন শিল্পে কাঠকয়লা বা চারকোল-এর ব্যবহার ও গুরুত্ব"-এর মধ্যে কাঠকয়লা দিয়ে চিত্রশৈলীর অনবদ্য রূপ ধরা পড়ে।কল্যাণী মিত্র ঘোষ -এর গল্প 'পরাণ সখা',ময়ূরী মিত্রের'সোনা কালো', সুনীল কুমার রায়-এর 'আজ ভুসুকু বাঙালি হলো', রঞ্জনা বসুর 'অমিতার পুজো',অলোকমুখোপাধ্যায়ের 'মনের কথা'-র মধ্যে গল্পের ধারা ও বাঁধনঅটুট।সুরজিৎ দেব রায়-এর রম্য রচনাটির পটভূমি শ্রীরামপুর স্টেশন,এখানে সামাজের সাথে লেখক ইতিহাসের যোগসূত্র রচনা করেছেন। সুদেষ্ণা চক্রবর্তী-র 'মুখোশ',মৌসুমী চৌধুরীর 'বিপুলের স্বপ্ন',গৌরাঙ্গ রায়-এর রহস্য গল্প'পূর্বাতে রহস্যভেদ' ; মুসা আলির বড় গল্প'নেতৃত্ব'; এই গল্পগুলির মধ্যে গল্পের আস্বাদন লাভের রসদ মজুত। গোপা মিত্র লিখেছেন কেদারনাথ ভ্রমণের স্মৃতি যা সাহিত্য গুণসমৃদ্ধ ও নান্দনিক।ঋদ্ধিরাজ রায় তার 'ওয়েবসিরিজ' প্রবন্ধে চলচ্চিত্র, সিরিয়াল, সিরিজ-এর এক্সপেরিমেন্টাল-এর বিষয়টি সুন্দর ভাবে পরিবেশন করেছেন তবে আলোচনার পরিসর আর একটু বড় হলে ভালো হত।
এই সংখ্যায় কবিতা লিখেছেন মৌ বন্দ্যোপাধ্যায়, নবোৎপল চন্দ, সুভাষচন্দ্র ঘোষ,অসীম মণ্ডল,স্বপন নাগ,সীমান্ত কুমার রায়,সুবীর ঘোষ, সুস্মিতা পাঁজা,
লালমোহন রায়,সুপর্ণা ঘোষ,কেয়া ঘোষ,প্রিয়াঙ্কা ঘোষ,শম্পা মোহান্ত,সুব্রত ঘোষ,কিছু কবিতা বিবরণ ধর্মী হয়ে গেছে। সর্বজনীনতা,সমাজ আঙ্গিকতা,গদ্য ছন্দ হলেও তার মধ্যে চোরা ছন্দ ও কাব্যিক মাধুর্য আগামী দিনে কবিদের মধ্যে প্রত্যাশা করবো,এর মধ্যে
সুভাষচন্দ্র ঘোষ -এর ছড়া,অসীম মন্ডল,স্বপন নাগ,শম্পা মোহান্তের কবিতা বেশ সমৃদ্ধ।
সুলগ্না রায় নারীবাদী’ নামক ছোট নিবন্ধে একটি কবিতারমাধ্যমে সমাজে মেয়েদের স্থান,নারী এবং পুরুষের পরিপূরকতার চালচিত্র এঁকেছেন চমৎকার।
শংকর ব্রক্ষ্মের ভ্রমণ কাহিনিটি উৎকৃষ্ট মানের, বিশ্বজিৎ সেনগুপ্তের 'বিশ্বাস অবিশ্বাস, সৌমিক ঘোষের'নিক্কন হাসছে',স্বাতী ব্যানার্জীর'রোদ',দেবারতি আচার্য-এর 'পাশের মানুষ' পিন্টু ভট্টাচার্য্য-এর'দালালি'সোমালী শর্মার 'ভালোবাসার প্রতিদান', পাপড়ি দত্তের 'হেমন্ত দিবসে', তিমির বরণ দাসের 'পঞ্চমী' ; অনন্ত কৃষ্ণ দে-র ভৌতিক গল্প ; সব গল্পই মনোগ্রাহী।রাজর্ষি চট্টপাধ্যায় ইংরেজিতে লিখেছেন 'বাথরুম' নামক গল্প।ঈস্পিতা সেনের ভ্রমণ কাহিনি 'হেমন্তের বাহার' গল্পসমূহে মুন্সিয়ানার ছাপ স্পষ্ট। কৃষ্ণা সাহা-র 'শেষবেলায়' উপন্যাসে টানটান গতিময়তা ও উপস্থাপনের আঙ্গিক পাঠক মহলে সমাদৃত হবে বলে আশা করা যায়। উপন্যাসের অন্তিমে কান্নাভেজা গলায় রমু বলে-"তুই কোথাও যাস না রে নীলু।এখানেই থাকবি।আমি সব ছেড়ে এখানেই থাকবো।সারাজীবন প্রায়শ্চিত্ত করবো আর তুই থাকবি তার সাক্ষী।"জীবন বোধের এই অভিব্যক্তি শেষবেলা ছাড়িয়ে পাঠককে কালবেলায় পৌঁছে দেয়।
ছোটদের বিভাগে অমিত দত্তের ট্রাফিক বিষয়ক ছড়া ও শ্রীজা রায়ের ভৌতিক গল্প,এবং ঋত্তিকা মুখার্জীর গল্পটি ভালো হয়েছে। দশম শ্রেণির ছাত্রী শরণ্যা বসুর অঙ্কনটি দৃষ্টিনন্দন একটি পটচিত্র,অসাধারণ এই অঙ্কনটি ছোটদের বিভাগে রাখলেই শোভনীয় হত।
সুমিত তালুকদারের ‘হাতের রান্নায় শিল্পের ছোঁয়া’ প্রবন্ধ, সুমনা চৌধুরীর 'পনীর বাটার মশলা' ও মনীষা বসুর 'সুজির আপ্পাম বড়া,এবং শ্রেয়সী মিত্রের ই'টালীয়ান হট চকোলেট ' -এ পাঠক ছত্রে ছত্রে পাবে রন্ধনশৈলীর অনবদ্য সব উপমার আস্বাদন। যা এই লিটল ম্যাগাজিনের বহুমুখী আঙ্গিকতাকে একটি ভিন্নধর্মী মাত্রায় পৌঁছে দেয়। প্রাচীন থেকে সাম্প্রতিক কালের রান্না ঘরের গুণগত পরিবর্তন সব কিছুই আছে এই সব লেখায়।
Du-কলম ১৪২৮, শীতকালীন এই দ্বিতীয় সংখ্যাটি ২১২ পৃষ্ঠার। এই সংখ্যাটির প্রচ্ছদ এবং অলংকরণ অবশ্যই প্রশংসার দাবি রাখে, কাগজ,প্রিন্ট ,কোয়ালিটি, বাইন্ডিং উৎকর্ষ মানের,তবে সূচিপত্রের সঙ্গে সৃজনউপস্থাপনের ক্ষেত্রে আরো যত্নশীল আগামীতে না হলে পাঠকের অসন্তুষ্টির কারণ হতে পারে। সূচির সাথে পৃষ্ঠা নম্মরের ক্রম সাজানো খাপছাড়া।তাছাড়া কিছু মুদ্রণ ত্রুটিও লক্ষ্যনীয়। পরিশেষে বলবো, লিটল ম্যাগাজিনের জগতে Du-কলম আগামীতে বাংলা সাহিত্যের আঙিনাকে সমৃদ্ধ ও নান্দনিক করে বাংলা ভাষা চর্চার ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিকতায় পৌঁছে দেবে তা নিশ্চিত।
Post a Comment